দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে গত ২৪ এপ্রিল সন্ধ্যায়, ১২ হাজার ৫৭ মেগাওয়াট। এর মাধ্যমে অতীতের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। এর আগে সর্বোচ্চ পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর, ১১ হাজার ৬২৩ মেগাওয়াট। এত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরও ঠিকমতো বিদ্যুৎ না পাওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শহরের মানুষ তুলনামূলক ভালো বিদ্যুৎ সুবিধা পেলেও গ্রামের মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। বৈষম্যমূলক এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে, সঞ্চালন এবং বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে মানুষ ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। মূলত উৎপাদনের এমন কৃতিত্ব সঞ্চালন ও বিতরণ দুর্বলতায় ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সম্প্রতি বলেছেন, সরকার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। গুণগত বিদ্যুৎ দিতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে। এ জন্য সরকারকে সময় দিতে হবে। এখন মানুষের কাছে নিরবচ্ছিন্ন এবং মানসম্মত বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়াই আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। আমরা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করছি। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থায় অনেক বিনিয়োগ দরকার। সেই অর্থের সংস্থান করে তবেই এগোতে হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট। ২০০৯ সাল পর্যন্ত দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৪ হাজার মেগাওয়াট। সরকারি হিসাবে এখন প্রায় ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। উৎপাদনের সঙ্গে বেড়েছে বিদ্যুতের গ্রাহকও। বর্তমানে প্রায় তিন কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহক। তবে সরকার বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন বাড়াতে সক্ষম হয়নি। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও নিরবচ্ছিন্ন বা ত্রুটিমুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না
গ্রীষ্মের শুরুতেই রাজধানীসহ আশপাশের জেলাগুলোয় অল্প পরিসরে লোডশেডিং শুরু হয়েছে। তবে এখনো সেটা সহনীয় মাত্রায়। অবশ্য গ্রামের মানুষের বিদ্যুৎ নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, বিশেষ করে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের বিতরণ এলাকায় বিদ্যুৎপ্রাপ্তি নিয়ে গ্রাহকদের রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। এখনো গ্রামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ১০ বছরে দেশে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য ৩ হাজার ৪৯৩ সার্কিট কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন বেড়েছে। এর আগে ২০০৯ সালে সঞ্চালন লাইনের পরিমাণ ছিল আট হাজার সার্কিট কিলোমিটার, যা এখন ১১ হাজার ৪৯৩ সার্কিট কিলোমিটারে পৌঁছেছে। একই সময় গ্রিড সাবস্টেশনের ক্ষমতা বেড়েছে ২৪ হাজার ১০৬ এমভিএ (মেগা ভোল্ট অ্যাম্পিয়ার)। ২০০৯ সালে যা ছিল ১৫ হাজার ৮৭০ এমভিএ, এখন বেড়ে হয়েছে ৩৯ হাজার ৯৭৬ এমভিএ। বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনের পরিমাণও এই সময়ে ২ লাখ ৪৮ হাজার কিলোমিটার বেড়েছে। ২০০৯ সালে যা ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার, এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ আট হাজার কিলোমিটার। কিন্তু এর পরও মানসম্মত বিদ্যুৎ বিতরণ করা যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বিদ্যুতের গ্রাহক। কিন্তু প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক অবকাঠামো বাড়েনি। ফলে সংকট বিরাজমান।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিতরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের লাইনগুলোর বেশিরভাগই পুরনো। এই পুরনো লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে বিভিন্ন সময় ত্রুটি দেখা দেয়।
এদিকে সম্প্রতি রমজানে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি সংক্রান্ত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেছেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো। বিদ্যুৎপ্রাপ্তি নিয়ে গ্রাহক খুশি। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ গেলেও তা লোডশেডিং নয়, বিদ্যুৎবিভ্রাট। বিদ্যুৎ উৎপাদন যথেষ্ট পরিমাণ হলেও বিদ্যুতের সঞ্চালন এবং বিতরণের উন্নয়নের কারণে সরবরাহে কখনো কখনো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সরকার বিতরণ ও সঞ্চালন নিয়েও কাজ করছে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, দেশে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২০ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু চাহিদা রয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের।
এ ছাড়া শীতকালে বিদ্যুতের চাহিদা আরও কমে যায় বলে প্রতিবেশী দেশ নেপালে শীতকালে বিদ্যুৎ রপ্তানির চিন্তা করছে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র অনেক সময় অলস পড়ে থাকবে।
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন উন্নয়নে অনেক অর্থের দরকার। আমরা বিতরণ ও সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু উৎপাদনের মতো সঞ্চালন ও বিতরণ খাতের প্রকল্পের জন্য অর্থ সংস্থান করা কঠিন। তবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত।



