শাহাদাত হোসেন : ফেনী ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০,
আর্সেনিকমুক্ত সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে সরকারের বাস্তবায়নাধীন গভীর নলকূপ প্রকল্প নিয়ে ফেনীতে নানা অভিযোগ উঠেছে। জেলার তিন উপজেলায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের আওতায় ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ হাজার ১৮৮টি গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কার্যাদেশের তোয়াক্কা না করে ঠিকাদাররা ইচ্ছামতো কাজ করছেন। শুধু তা-ই নয়, সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি নলকূপের জন্য সাত হাজার টাকা জমা দেয়ার কথা থাকলেও আদায় করা হচ্ছে ১৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। আবার নলকূপ স্থাপনে নিয়োজিত শ্রমিকদের খাওয়া খরচসহ নানা অজুহাতেও তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা নেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে ভুক্তভোগী এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাঝেও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সদর উপজেলার কালিদহ ইউনিয়নের ভালুকিয়া গ্রামের এক বাড়িতেই গিয়ে পাওয়া গেছে এ প্রকল্পের ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র। ওই বাড়ির আবদুল লতিফ নলকূপের জন্য ঠিকাদারের লোকজনকে ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। এ ছাড়া আরো তিন হাজার টাকা দিয়েছেন শ্রমিকদের খাওয়া বাবদ। একই বাড়ির বৃদ্ধ এবাদুল হক জানান, তার ছেলে শাহ আলম ৯ হাজার ও শেখ আহমদ ১৫ হাজার টাকা নলকূপের জন্য জমা দিয়েছেন। ১৫ মাস আগে ওই টাকা দিয়ে বারবার ঠিকাদারের কাছে ধরনা দিলেও অদ্যাবধি নলকূপগুলো বসানো হয়নি। আরেক বৃদ্ধ মকবুল আহমদ জানান, ঠিকাদারের কাছে অন্তত ৫০ বার গিয়ে ট্যাংক ও মোটর আদায় করলেও অদ্যাবধি বৈদ্যুতিক তার পাননি। অফিসে গিয়ে দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন তিনি।
ছনুয়া ইউনিয়নের দমদমা গ্রামের ইব্রাহিম জমাদ্দার বাড়ির মোহাম্মদ ইউসুফের স্ত্রী ছবুরা খাতুন জানান, মাসখানেক আগে তার বাড়িতে নলকূপের পাইপ স্থাপন করা হলেও মোটর, ট্যাংক কিছুই পায়নি।
ধলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার আহমেদ মুন্সী জানান, তার ইউনিয়নে ১৫০ নলকূপের মধ্যে মাত্র তিনটি স্থাপন করা হয়েছে। পাঁচগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মানিক জানান, তার ইউনিয়নে ১৫০ নলকূপের মধ্যে কয়েকটিতে পাইপ স্থাপন করা হলেও অদ্যাবধি একটাও চালু করা হয়নি। কে কোনোটিতেই মোটর-ট্যাংক দেয়া হয়নি। সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন বাদল জানান, তার ইউনিয়নে বরাদ্দকৃত ৫০টি নলকূপের মধ্যে ইতোমধ্যে ২২টি স্থাপন করা হয়েছে। তবে এগুলোর বেশির ভাগই অসম্পূর্ণ।
আবার কোনো ইউনিয়নে ভিন্ন চিত্রও আছে। ইউপি চেয়ারম্যানদের এড়িয়ে ঠিকাদার নিজেই বাড়তি টাকা নিয়ে ইচ্ছামতো কাজ করেছেন। সদর উপজেলার কাজিরবাগ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কাজী বুলবুল আহমেদ সোহাগ জানান, তিনি প্রকল্পের তালিকা জমা দেয়ার আগেই ঠিকাদাররা সরাসরি লোকজন থেকে টাকা নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় নলকূপ স্থাপন করেছেন। এতে তার প্রকল্পের তালিকা বাদ পড়ে যায়। শর্শদী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জানে আলম ভূঞা জানান, তার ইউনিয়নে কিছু দিন আগেই কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ৫-৬টি স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর সূত্র জানায়, জেলায় আর্সেনিক প্রকল্পে চার হাজার ১৮৮টি গভীর নলকূপ বরাদ্দ হয়। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১ হাজার ২৮৬টি, দাগনভূঞা উপজেলায় ১ হাজার ৪৫০টি ও সোনাগাজী উপজেলায় ১ হাজার ৪৫২টি স্থাপনের কথা রয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছর ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমবিডিএস ও জামাল অ্যান্ড ব্রাদার্স। প্রতিটি নলকূপে ৭২০ ফুট গভীরতা, ২২০ বর্গমিটার প্লাটফর্ম পাকাকরণ, একটি দেড় ইঞ্চি মোটর ও ৫০০ লিটার ট্যাংক দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ৭২০ফুট গভীরতায় ৮০ ফুটে ৩ ইঞ্চি পরিমাণ ও বাকি ৬৬০ ফুটে দেড় ইঞ্চি পরিমাণ পাইপ, ইটের গাঁথুনি করে পাঁচ ফুট উঁচু ট্যাংকের ফিটিং বেজ করার কথা রয়েছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কোনোটিতে কার্যাদেশ মেনে কাজ করা হয়নি। প্রতিটি নলকূপ স্থাপনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের ব্যয় বরাদ্দ এক লাখ ১৪ হাজার ৮০০ টাকা।
এ দিকে মৌখিকভাবে জানালেও এ পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি বলে জানালেন নির্বাহী প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন। তিনি বলেন, লিখিত অভিযোগ ছাড়া আমরা কী করতে পারি। তবে এ সম্পর্কে ফেনীস্থ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের পক্ষ থেকে সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। এর বেশি বলতে রাজি হননি নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানায়, সব কাজ শেষ না করে সম্পূর্ণ বিল দিতে রাজি না হওয়ায় সম্প্রতি এক ঠিকাদারের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন সদর উপজেলা প্রকৌশলী। ঠিকাদাররা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের নানা অনিয়ম জেনেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নীরব ভূমিকায় রয়েছেন।
জানতে চাইলে ঠিকাদার হুমায়ুন আহমেদ জানান, তিনি যেসব কাজ করেছেন সবগুলোতে মোটর, ট্যাংক প্রদানসহ যথাযথভাবে সরকারি নির্দেশনা মানা হচ্ছে। প্রকল্পের বেশির ভাগ কাজই চলমান রয়েছে। তবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক প্রকৌশলীর ঘুষ দাবির কারণে কাজে ধীরগতি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জানতে চাইলে সোনাগাজী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন বলেন, গভীর নলকূপ প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। অবৈধ সুবিধা নিতে কতিপয় ব্যক্তি তার নাম ব্যবহার করতে পারে। জামাল অ্যান্ড ব্রাদার্স নামে কোনো প্রতিষ্ঠানকে চেনেনও না বলে জানান তিনি।
অপর ঠিকাদার আরিফের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
©®নয়া দিগন্ত





