শাহজালাল রতন : ফেনীতে বৃত্তির নামে অবাধে চলছে প্রতারণা। পরীক্ষার ফি বাবদ অভিভাবকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। আকর্ষণীয় পুরস্কার, নগদ অর্থ ও সনদ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের প্রলুব্ধ করা হয়। ফেসবুক ও বিভিন্ন স্কুলে প্রচারপত্র বিলি করে আগ্রহ সৃষ্টি করা হয় স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের। এক শ্রেণির শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও অসাধু সরকারি কর্মচারীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় চলে এ ব্যবসা।
জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগ সূত্র জানায়, বেসরকারিভাবে বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া অবৈধ। রেজিস্ট্রেশন ফি ও অন্য যে কোনো নামে অর্থ সংগ্রহ দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রশাসনের কড়াকড়িতে কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের অগোচরে ও নিষ্ফ্ক্রিয়তার সুযোগে গত বছর থেকে ফের বৃত্তি ব্যবসা চালু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর ফেনী জেলা ও বিভিন্ন উপজেলা এলাকায় বৃত্তির নামে বিভিন্ন চক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আগামী ডিসেম্বরকে টার্গেট করে শুরু হয়েছে প্রচার। সাধারণত তৃতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলা হয়ে থাকে। ফেনীতে এমন বৃত্তি প্রতিষ্ঠান কমপক্ষে ৫০টির মতো রয়েছে বলে সংশ্নিষ্ট একাধিক সূত্র অভিযোগ করেছে। পরীক্ষার্থী সংগ্রহে ও তাদের প্রলুব্ধ করতে স্কুলে স্কুলে প্রচারপত্র দিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রলুব্ধ করা হয়। ফেসবুকে স্ট্যাটাস ও বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়।
এমনি একটি ফেসবুক প্রচারপত্র সংশ্নিষ্টদের নজরে এসেছে বলে জানা যায়। ফেসবুক বিজ্ঞপ্তিতে আলোকিত ফেনী, টিচার্স ওয়েলফেয়ার, অফসেট ডোসিপ, খুরশীদ আহমেদ বৃত্তির ফরম বিতরণ ও জমা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। সাইমুন প্রকাশনী নামের একটি প্রকাশনা সংস্থায় অফিসে বিভিন্ন স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, এক শ্রেণির শিক্ষক অর্থের লোভে এর সঙ্গে তাদের ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর দেন। প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন কৌশলে প্রশাসনের কোনো কোনো মহলকেও হাতে রাখে। জড়িত রয়েছে এক শ্রেণির সরকারদলীয় নেতাকর্মী।
জানা যায়, প্রতিটি অবৈধ বৃত্তি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষার ফি বাবদ প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে দেড়শ’ থেকে দুইশ’ টাকা নিয়ে থাকে। বৃত্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর টার্গেট থাকে দুই হাজার পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণ। এতে তাদের কমপক্ষে দুই লাখ থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়ে থাকে। ফেনীর কাশেরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র আবু আহম্মদের বাবা সিরাজুল ইসলাম জানান, তার ছেলে এর আগে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তার অভিযোগ, মেধাবৃত্তির নামে ওই প্রতিষ্ঠান মাত্র ২৫ ছাত্রছাত্রীকে পাঁচশ’ টাকা করে এককালীন বৃত্তি ও সনদ দিয়েছে। বৃত্তির নামে সংগ্রহ করা বাকি টাকা প্রতিষ্ঠানটি লাভ করেছে।
ফেনীর সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহ আলম জানান, বিভিন্ন নামে শিশুদের বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার কথা তিনি শুনেছেন। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসন থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে বলে তিনি জানান। ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সুজন চৌধুরী জানান, বৃত্তির নামে প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে তৎপরতা চালানো সম্ভব হবে না। একটি প্রতিষ্ঠানের বৃত্তি পরীক্ষা তিনি বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানান।
ফেনীর জেলা প্রশাসক ওয়াহিদুজজামান স্বীকার করেছেন, মেধা বিকাশের নামে অবৈধ বৃত্তির ব্যবসা করার পাঁয়তারা যারা করছে, তাদের ব্যাপারে প্রশাসন সজাগ রয়েছে। এর সঙ্গে কোনো শিক্ষক জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বৃত্তির নামে পরীক্ষা গ্রহণের খবর পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালানো হবে। কেউ মেধাবীদের বৃত্তি দিতে চাইলে বিভিন্ন স্কুলের ক্লাসগুলোর মেধা তালিকা দেখে বৃত্তি দিতে পারবেন; কিন্তু পরীক্ষা বা ফি নেওয়া যাবে না।
– সমকাল





