নিজস্ব প্রতিনিধিঃ- আলোচিত ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একরামুল হক একরাম হত্যার ৭ বছর আজ।আলোচিত এ হত্যাকান্ডের নৃশংসতা দেশ-বিদেশে ব্যপক সাড়া ফেলেছিল। তবে আলোচিত ওই হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পূর্ণ হতে চললেও হত্যা মামলার রায় এখনো কার্যকর হয়নি।নিম্ন আদালতের পরে হাইকোর্টে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিলের শুনানি এখনও শুরু হয়নি।রায়টি নিষ্পত্তি হতে ধীরগতির কারণে হতাশা প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজনরা। তাদের দাবি, উচ্চ আদালত যেন দ্রুত এই হত্যাকাণ্ডে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির রায় কার্যকর করেন।এদিকে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ১৭ জন পলাতক আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবার ও দলীয় নেতাকর্মী এবং এলাকাবাসী। তবে একরামের পরিবার, দলীয় নেতাকর্মী ও এলাকাবাসীর মধ্যে অনেকেই চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকান্ডের বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। তাদের চোখেমুখে ভয়-আতঙ্কের চাপ পরিলক্ষিত দেখা গেছে।
মামলার বাদী ও একরামের বড় ভাই রেজাউল হক জসিম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, রায় ঘোষণা পরবর্তী আসামিদের আপিল করার পর উচ্চ আদালতে এ মামলার ফাইল নিচে পড়ে যায়। পলাতক আসামিরাও গ্রেফতার হয়নি। ফলে ন্যায় বিচার পাওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও সরকারের নিকট দ্রুত রায় কার্যকর করার জোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা জানান, একরামকে প্রকাশ্য দিবালোকে নির্মমভাবে হত্যা করলেও দন্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিরা এখনো গ্রেফতার হয়নি।আবিদসহ কয়েকজন পলাতক আসামি বিদেশে চলে যাওয়ার বিষয়ে পুলিশের ভুমিকা নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
দেলোয়ার হোসেন নামে স্থানীয় বাসিন্দা জানিয়েছেন, একরামকে হত্যা করে নেতৃত্ব শুন্য করা হয়েছে।কিন্তু রায় ঘোষনা হলেও তা এখনও কার্যকর হয়নি।রায় কার্যকর করা এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি বলে জানান তিনি।
ফেনীর পুলিশ সুপার খোন্দকার নুরুন্নবী জানান, একরাম হত্যা মামলার পলাতক আসামীদের ব্যাপারে তার পরিবারের কেউ বিষয়টি আমাকে অবগত করেনি।এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে ২০১৪ সালের ২০ মে প্রকাশ্যে ফেনী শহরের একাডেমি এলাকায় একরামকে গুলি করে, কুপিয়ে ও গাড়িসহ পুড়িয়ে নৃংশসভাবে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হত্যার ঘটনায় জড়িত একের পর এক হত্যাকারী গ্রেফতার হতে থাকলে ঘটনার নৈপথ্য কাহিনীর মুখোষ উম্মোচিত হয়। বেরিয়ে আসে সরকার দলীয় অন্তঃকোন্দলের কারণে হত্যার কারণ। হত্যার সাথে রাঘব-বোয়ালদের নাম বেড়িয়ে এলে গা ঢাকা দিয়ে আত্মগোপনে চলে যায় হত্যাকারীরা। ঘটনার প্রতিবাদে ও হত্যাকারীদের গ্রেফতার দাবিতে ফুসে ওঠে এলাকাবাসী। হরতাল-অবরোধ-বিক্ষোভসহ মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মস‚চি পালন করে তারা।
এঘটনায় তার বড় ভাই রেজাউল হক জসিম বাদী হয়ে বিএনপি নেতা মাহাতাব উদ্দিন চৌধুরী মিনারের নাম উলেখ করে অজ্ঞাত ৩০-৩৫ জনকে আসামি করে ফেনী থানায় মামলা করে। হত্যার একশ দিন পর ওই বছরের ২৮ আগষ্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ ৫৬ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগ পত্র (চার্জশীট) দাখিল করে। আদালত ১২ নভেম্বর আলোচিত এ হত্যা মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ করে। অভিযোগপত্র দাখিলের ১৬ মাস পর ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ আদালত মামলার চার্জ (বিচারকাজ) গঠন করে। পরবর্তীতে স্বাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে বিচারকাজ শুরু হয়।
আদালত মামলার বাদী একরামের ছোট ভাই এহসানুল হক, নিহতের স্ত্রী তাসমিন আক্তার, গাড়ি চালক আবদলাহ আল মামুনসহ ৫০ জন স্বাক্ষীর স্বাক্ষ্যগ্রহণ করেছে। মামলার অভিযোগপত্রে পুলিশ ৫৯ জনকে স্বাক্ষী করেছিলো। এদের মধ্যে সাধারণ স্বাক্ষী রয়েছে ২৮ জন। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ১৬ জন আসামি হত্যার দ্বায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছেন। হত্যায় ব্যবহৃত একাধিক চাপাতি ও ৫টি পিস্তলের মধ্যে কয়েকটি চাপাতি এবং দুটি পিস্তল উদ্ধার করেছে পুলিশ।
২০১৮ সালের ১৩ মার্চ দুপুরে ফেনী জেলা ও দায়রা জজ আমিনুল হক এই মামলার রায় ঘোষনা করেন। রায়ে ৩৯ জন আসামিকে মৃত্যুদন্ড এবং ১৬ জনকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে। ওইদিন একরামের পরিবারের কাউকে আদালত ভবন এলাকায় দেখা যায়নি।
আদালত পর্যবেক্ষনে বলেন, স্থানীয় নির্বাচন থেকে আসামিদের সঙ্গে নিহতের দ্বন্দের স‚ত্রপাত হয়। রাজনৈতিক দ্বন্দের কারণে পরিকল্পিতভাবে একজন জনপ্রতিনিধিকে ষড়যন্ত্র করে দিবালোকে হত্যা করা হয়েছে।
ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ২২ জন রয়েছেন কারাগারে, আটজন জামিনে মুক্ত হয়ে পলাতক আছেন এবং চার্জশীটভুক্ত নয়জন শুরু থেকে পলাতক রয়েছেন।
দন্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে পলাতক আসামিরা হলেন- ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হোসেন জিহাদ, সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারির মামাতো ভাই আবিদুল ইসলাম আবিদ, চৌধুরী মো. নাফিজ উদ্দিন অনিক, আরমান হোসেন কাউসার, জাহেদুল হাসেম সৈকত, জিয়াউর রহমান বাপ্পি, জসিম উদ্দিন নয়ন, এমরান হোসেন রাসেল ওরফে ইঞ্জি. রাসেল, রাহাত মো. এরফান ওরফে আজাদ, একরাম হোসেন ওরফে আকরাম, শফিকুর রহমান ওরফে ময়না, কফিল উদ্দিন মাহমুদ আবির, মোসলে উদ্দিন আসিফ, ইসমাইল হোসেন ছুট্টু, মহিউদ্দিন আনিছ, বাবলু ও টিটু।
এদের মধ্যে হত্যাকান্ডের সঙ্গে একেবারে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত জাহিদ হোসেন জিহাদ ও আবিদুল ইসলাম আবিদ পালিয়ে দেশের বাইরে চলে গেছে বলে এলাকাবাসীর ধারণা।
এই হত্যা মামলায় ফাঁসির দন্ডিত কারাবন্দি ২২ জন হলেন- হত্যার পরিকল্পনাকারী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির আদেল, ফেনী পৌরসভার কাউন্সিলর আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহিল মাহমুদ শিবলু, সাজ্জাদুল ইসলাম পাটোয়ারী ওরফে সিফাত, আবু বক্কার সিদ্দিক ওরফে বক্কর, মো. আজমির হোসেন রায়হান, মো. শাহজালাল উদ্দিন শিপন, জাহিদুল ইসলাম জাহিদ ওরফে আজাদ, কাজী শানান মাহমুদ, মীর হোসেন আরিফ ওরফে নাতি আরিফ, আরিফ ওরফে পাঙ্কু আরিফ, রাশেদুল ইসলাম রাজু, মো. সোহান চৌধুরী, জসিম উদ্দিন নয়ন, নিজাম উদ্দিন আবু, আবদুল কাইউম, নুর উদ্দিন মিয়া, তোতা মানিক, মো. সজিব, মামুন, রুবেল, হুমায়ুন ও টিপু।
খালাসপ্রাপ্ত ১৬ জন হলেন- প্রধান আসামি জেলা তাঁতী দলের সভাপতি মাহতাব উদ্দিন আহম্মেদ চৌধুরী মিনার, একরামের একান্ত সহযোগী





